1. editor@munshiganjsangbad.com : editor :
  2. kaium07bics@gmail.com : madmin :
August 19, 2026, 12:35 am

সংরক্ষিত প্রত্নস্থানে প্রকাশ্য দিবালোকে মাটি কাটা, বিক্রির অভিযোগ—প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

মুন্সীগঞ্জ সংবাদ ডেস্ক
  • Update Time : Sunday, August 16, 2026,
  • 19 Time View

মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার ঐতিহাসিক নাটেশ্বর প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে ভেকু (এক্সকাভেটর) দিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে মাটি কেটে জমি সমতল করার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে কাটা মাটি বিক্রি এবং ভবিষ্যতে ওই জায়গা প্লট আকারে বিক্রির পাঁয়তারা চলছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
হাজার বছরের প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনসমৃদ্ধ এই প্রত্নস্থানে ভারী যন্ত্র দিয়ে মাটি কাটার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তাদের প্রশ্ন—সরকারি ও প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি সংরক্ষিত এলাকায় কীভাবে ভেকু ঢুকিয়ে মাটি কাটার কাজ চলছে?
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নাটেশ্বর এলাকায় প্রায় ছয় একর জায়গাজুড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার নিদর্শন রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় দুই একর ২০ শতাংশ জমি প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও গবেষণার কাজে অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের নামে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে খননকাজ বন্ধ থাকায় জায়গাটি অনেকটা অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সুযোগে সালাম শেখ, আমির শেখ ও সেলিম শেখ নামের তিন ভাই গত দুই দিন ধরে ওই এলাকায় ভেকু এনে মাটি কাটা ও জমি সমতল করার কাজ করছেন। ইতোমধ্যে কেটে নেওয়া কিছু মাটি বিক্রি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবি, বিষয়টি শুধু মাটি কাটার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জমি সমতল করে ভবিষ্যতে সেখানে প্লট তৈরি করে বিক্রির পরিকল্পনা থাকতে পারে। তবে মাটি কাটা বা জমি সমতল করার জন্য কোনো সরকারি অনুমোদন, ইজারা কিংবা প্রশাসনিক ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
প্রত্নসম্পদ ধ্বংসের আশঙ্কা:
সচেতন মহলের মতে, নাটেশ্বরের মাটির নিচে এখনো বহু অজানা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। খনন ও গবেষণার কাজ সম্পূর্ণ না হওয়া অবস্থায় ভারী যন্ত্র দিয়ে মাটি কাটলে মাটির নিচে থাকা প্রত্ননিদর্শন, স্থাপত্য কাঠামো, সাংস্কৃতিক স্তর ও প্রত্নসম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে।
প্রত্নস্থানের মাটি সরিয়ে ফেলা শুধু ভূমির পরিবর্তন নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে হাজার বছরের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
আন্তর্জাতিক গুরুত্ব পাওয়া নাটেশ্বর:
নাটেশ্বর শুধু স্থানীয়ভাবে নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হিসেবে পরিচিত। ২০১৩ সাল থেকে অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন ও চীনা প্রত্নতাত্ত্বিকদের যৌথ উদ্যোগে এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন পরিচালিত হয়ে আসছে।
খননে প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির-নগরী, অষ্টকোণাকৃতির স্তূপ, ইটনির্মিত নালা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যিক নিদর্শনের সন্ধান পাওয়া গেছে।
২০২৫ সালের ১৬ মার্চ চীনা প্রতিনিধি দলের পরিদর্শন:
নাটেশ্বরের গুরুত্বের আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ চীনের ন্যাশনাল কালচারাল হেরিটেজ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (NCHA) প্রশাসক ও সংস্কৃতি ও পর্যটন উপমন্ত্রী লি কুনের নেতৃত্বে চীনা প্রতিনিধি দলের নাটেশ্বর প্রত্নস্থল পরিদর্শন।
এ সময় চীনা প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন মুন্সীগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মো. মাহমুদুর রহমান খোন্দকার, টঙ্গিবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ওয়াজেদ ওয়াসীফ।
পরিদর্শনকালে চীনা প্রতিনিধি দলের সদস্যরা নাটেশ্বরের আবিষ্কৃত প্রত্ননিদর্শন ঘুরে দেখেন এবং এগুলোর সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
চীন-বাংলাদেশের চুক্তিতেও নাটেশ্বর:
নাটেশ্বরের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয় বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত বিভিন্ন সমঝোতা ও চুক্তিতে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিভিন্ন সমঝোতা, ঘোষণা ও দলিল স্বাক্ষরিত হয়। এর মধ্যে মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ীর নাটেশ্বর প্রত্নতাত্ত্বিক খনন প্রকল্পের সংরক্ষণ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট পার্ক নির্মাণসংক্রান্ত বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
পরিকল্পনা অনুযায়ী নাটেশ্বর প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকাকে আন্তর্জাতিক মানের প্রত্নতাত্ত্বিক পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এমন একটি আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন প্রত্নস্থানে অবাধে মাটি কাটা হলে তা বাংলাদেশের প্রত্নঐতিহ্যের জন্য বড় হুমকি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণার পরও মাটি কাটা!
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, নাটেশ্বরের প্রত্নতাত্ত্বিক খনন প্রকল্প এলাকাকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে সেখানে সাইনবোর্ডও স্থাপন করা হয়েছে। এরপরও কীভাবে সেখানে ভেকু ঢুকিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, সংরক্ষিত প্রত্নস্থানের সীমানা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের দখল, মাটি কাটা কিংবা অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

অভিযোগের বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. রেজাউল করিম বলেন, এ বিষয়ে টঙ্গিবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে তাঁর বদলির আদেশ হয়ে যাওয়ায় হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। রবিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযুক্ত সালাম শেখ, আমির শেখ ও সেলিম শেখের বক্তব্য জানতে তাদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোন ধরেননি।
দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে হারিয়ে যেতে পারে হাজার বছরের ইতিহাস
নাটেশ্বরের মাটির নিচে থাকা প্রত্নসম্পদ বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাস ও সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ দলিল। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে ইতোমধ্যে যেসব নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে, তার বাইরেও মাটির নিচে আরও বহু অমূল্য তথ্য ও প্রত্নসম্পদ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
তাই স্থানীয়দের দাবি, অবিলম্বে ভেকু দিয়ে মাটি কাটা বন্ধ করতে হবে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই, মাটি কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং প্রত্নস্থানের পুরো জমির সীমানা নির্ধারণ করে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রশ্ন একটাই—যে নাটেশ্বরের প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণে বাংলাদেশ ও চীন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্যোগ নিয়েছে, সেই নাটেশ্বরের মাটিই যদি প্রকাশ্য দিবালোকে কেটে বিক্রি করা হয়, তাহলে হাজার বছরের এই ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ব নেবে কে?

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

আজকের পত্রিকা

[foogallery id=”8441″]

© All rights reserved © 2025