মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরের কৃতীসন্তান, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সংগঠক ও সহঅধিনায়ক প্রতাপ শংকর হাজরার পরিবারের পৈতৃক ভিটাবাড়ি মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই পাকিস্তানি বাহিনীর আগুনে পুড়ে যায়। সেই আগুনে ধ্বংস হয় বহু মূল্যবান জমির দলিল-দস্তাবেজ। পরে জালিয়াতির মাধ্যমে পরিবারের বিপুল পরিমাণ পৈতৃক সম্পত্তি দখল হয়ে যায় বলে অভিযোগ তাঁর। এমনকি হাসপাতালের জন্য দান করা জমিও জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে অন্যরা ভোগদখল করছে বলে দাবি করেন এই কিংবদন্তি ক্রীড়াবিদ। ২০১৫ সালে মুন্সীগঞ্জ সংবাদকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে জীবনের এই বেদনাদায়ক অধ্যায়ের পাশাপাশি তিনি তুলে ধরেন মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল এবং দেশের ক্রীড়াঙ্গনের নানা স্মৃতি:
মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুরের কৃতীসন্তান, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সংগঠক ও সহঅধিনায়ক প্রতাপ শংকর হাজরার সঙ্গে ২০১৫ সালে দীর্ঘ সময় আলাপের সুযোগ হয়েছিল। তখন তাঁর বয়স ছিল ৭৩ বছর। আজ তিনি ৮৪ বছরে পদার্পণ করেছেন। সেই স্মৃতিচারণে উঠে আসে দেশের ক্রীড়াঙ্গন, মুক্তিযুদ্ধ এবং ব্যক্তিগত জীবনের বহু অজানা তথ্য।
১৯৪২ সালে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার দোগাছি গ্রামের ঐতিহ্যবাহী হাজরা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন প্রতাপ শংকর হাজরা। তিনি একই সঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল ও জাতীয় হকি দলে খেলেছেন। জাতীয় যুব ফুটবল দলের সহঅধিনায়ক ছিলেন এবং দীর্ঘদিন মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। পরবর্তীতে ক্লাবটির পরিচালক, অন্তর্বর্তীকালীন কোচ এবং বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
তিনি জানান, ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৭৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত নিয়মিত খেলেছেন। পরে দক্ষ খেলোয়াড়ের সংকট থাকায় ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত অনিয়মিতভাবে মাঠে নামতে হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “আমাকে খেলানোর জন্য ধরে নিয়ে আসা হতো।”
মুক্তিযুদ্ধে ফুটবল ছিল অস্ত্র:
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাকিস্তানি বাহিনীর আগুনে পুড়ে যায় তাদের হাজরা বাড়ি। আগুনে ধ্বংস হয় বহু মূল্যবান দলিল-দস্তাবেজও। প্রতাপ শংকর হাজরা অভিযোগ করেন, পরবর্তীতে জালিয়াতির মাধ্যমে তাঁদের বহু পৈতৃক সম্পত্তি দখল করা হয়েছে। এমনকি তাঁদের পরিবারের দান করা হাসপাতালের জমিও জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে অন্যরা ভোগদখল করছে।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের পর তিনি অস্ত্র হাতে নয়, ফুটবলকে হাতিয়ার করেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। জাকারিয়া পিন্টুর নেতৃত্বে ৩১ জন খেলোয়াড়কে নিয়ে গঠিত হয় স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। প্রতাপ শংকর হাজরার ছদ্মনাম ছিল “তুর্য হাজরা”।
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল ভারতের বিভিন্ন স্থানে মোট ১৬টি প্রীতি ম্যাচ খেলে। এসব ম্যাচের মাধ্যমে তারা একদিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তোলে, অন্যদিকে সংগ্রহ করে প্রায় ৫ লাখ টাকা, যা মুক্তিযুদ্ধের জন্য অস্ত্র কেনায় ব্যয় করা হয়।
তিনি জানান, একটি ম্যাচে ভারতের কিংবদন্তি ক্রিকেটার নবাব মনসুর আলী খান পতৌদিও খেলেছিলেন এবং একটি গোল করেছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের জন্য ২০ হাজার টাকা অনুদান দেন।
খেলোয়াড়ি মনোভাবই ছিল সবচেয়ে বড় পরিচয়:
প্রতাপ শংকর হাজরার কাছে খেলোয়াড়ের নৈতিকতা ছিল সর্বোচ্চ গুরুত্বের বিষয়। তাই ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলের প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ শ্রদ্ধা। অন্যদিকে ডিয়েগো ম্যারাডোনার মাদকাসক্তিকে তিনি অখেলোয়াড়সুলভ আচরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
ফুটবল নিয়ে নিজের মূল্যায়নে তিনি বলেন, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো যেকোনো দলে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবেন, কিন্তু লিওনেল মেসি বার্সেলোনার বাইরে একইভাবে সফল হতে পারবেন না বলে তাঁর ধারণা ছিল। ব্রাজিলের রোনালদোকেও তিনি অসাধারণ খেলোয়াড় হিসেবে মূল্যায়ন করেন।
হারানো ভিটেমাটি নিয়ে স্মৃতি:
বর্তমানে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় স্ত্রী ও দুই কন্যাকে নিয়ে বসবাস করেন প্রতাপ শংকর হাজরা।
পৈতৃক সম্পত্তি দখল হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গে তিনি একটি স্মৃতিচারণ করেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে এক ইফতার অনুষ্ঠানে দেখা হলে, এরশাদ তাঁকে চিনে ফেলেন এবং পরিচয় দেন। তখন প্রতাপ শংকর হাজরা এরশাদের পাশেই বসা এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকে দেখিয়ে বলেন, “আপনার পাশে যিনি বসে আছেন, তিনি একজন ভূমিদস্যু। আমার সব জমি তিনি দখল করে নিয়েছেন।”
তাঁর এই বক্তব্যে ওই নেতার মুখ মুহূর্তেই ম্লান হয়ে যায়। প্রতাপ শংকর হাজরা বলেন, “এই ঘটনাটাই আমার অনেক আক্ষেপ কমিয়ে দিয়েছে।”
উল্লেখ্য, প্রতাপ শংকর হাজরা ওই রাজনৈতিক নেতার নাম প্রকাশ করতে চাননি। পরে জানা যায়, তিনি ছিলেন প্রয়াত শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন।