বাংলাদেশের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের ইতিহাসে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এক উজ্জ্বল ও অনিবার্য নাম। নব্বই বছরে পদার্পণের এই বিশেষ মুহূর্তে তাঁকে ঘিরে ফিরে দেখা যায় এক দীর্ঘ সংগ্রামী, মননশীল ও আলোকিত জীবনের পথচলা—যেখানে শিক্ষা, সমাজচিন্তা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ একাকার হয়ে গেছে।
১৯৩৬ সালের ২৩ জুন মুন্সীগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বাড়ৈখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাবা হাফিজ উদ্দিন চৌধুরী ও মা আসিয়া খাতুনের সন্তান সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর শৈশব কেটেছে রাজশাহী ও কলকাতায়। পরবর্তীতে ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুল, নটরডেম কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে; গবেষণা করেন লীডস বিশ্ববিদ্যালয় ও লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে।
দেশে ফিরে শিক্ষকতাকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দু করে নেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে দীর্ঘ সময় অধ্যাপনা করে তৈরি করেছেন অসংখ্য শিক্ষার্থী, গবেষক ও চিন্তাশীল মানুষ। তাঁর ক্লাস ছিল কেবল পাঠদান নয়—ছিল সমাজ, ইতিহাস, সাহিত্য ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার এক গভীর পাঠ।
শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন প্রথিতযশা লেখক, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক হিসেবে। সাহিত্য, সমাজ, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে তাঁর অসংখ্য প্রবন্ধ পাঠকের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। আশির দশকে “গাছপাথর” ছদ্মনামে তাঁর ধারাবাহিক লেখাগুলো বিশেষভাবে আলোচিত হয়। সম্পাদনা করেছেন ‘পরিক্রমা’, ‘সাহিত্যপত্র’, ‘সচিত্র সময়’, ‘সাপ্তাহিক সময়’, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা’সহ নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘নতুন দিগন্ত’ মুক্তচিন্তা ও প্রগতিশীল চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে ওঠে।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কেবল একাডেমিক জগতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; সমাজ ও মানুষের প্রশ্নে তিনি ছিলেন সরব কণ্ঠ। পরিবেশ রক্ষা, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায্যতা এবং জনস্বার্থের বিভিন্ন বিষয়ে তিনি স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। টিপাইমুখ বাঁধের বিরোধিতা, আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দর নির্মাণের প্রতিবাদ কিংবা নগর পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে তাঁর অংশগ্রহণ তাঁকে একজন সচেতন জনবুদ্ধিজীবী হিসেবে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।
তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৭৬ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৯৬ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। এছাড়া তিনি ইউজিসি অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে সম্মানিত হন।
নব্বই বছরে এসে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আজও একটি নাম নয়, একটি চেতনা। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জ্ঞান তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের পাশে দাঁড়ায়; শিক্ষা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা সমাজকে আলোকিত করে।
তাঁর ৯০তম জন্মদিনে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও শুভকামনা। তাঁর দীর্ঘ জীবনের চিন্তা, কর্ম ও আলোকধারা আগামী প্রজন্মকে আরও বহুদিন পথ দেখাক।