শ্রীনগরের ভাগ্যকূল। উত্তর বালাসুরের বিলের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো একটি বাড়ি। সময়ের ক্ষয়ে যার জৌলুশ অনেকটাই ম্লান, দেয়ালে জমেছে বয়সের ছাপ। অথচ এই বাড়ির প্রতিটি ইট-পাথরের সঙ্গে মিশে আছে বিক্রমপুরের ইতিহাস, একটি জমিদার পরিবারের স্মৃতি এবং দুই বাংলার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এক পারিবারিক অধ্যায়।
এটি সাবেক জমিদার যদুনাথ রায়ের বাড়ি। আজ সেই ঐতিহাসিক বাড়ির আঙিনাতেই গড়ে উঠেছে ‘বিক্রমপুর জাদুঘর’। সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়ে সামাজিক সংগঠন অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন পরিচালিত এই জাদুঘর এখন শুধু কিছু পুরোনো নিদর্শন সংরক্ষণের স্থান নয়; এটি হয়ে উঠেছে বিক্রমপুরের অতীতকে বর্তমান প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
আর এই জাদুঘরের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কলকাতার শোভাবাজারের একটি পরিবার। যে পরিবারের পূর্বপুরুষের স্মৃতি আজও তাঁদের বৈঠকখানার দেয়ালে ঝুলছে।
যে বাড়ি ছেড়ে একদিন চলে যেতে হয়েছিল:
১৯৬৫ সাল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির মধ্যে যদুনাথ রায় তাঁর প্রাসাদ ছেড়ে ভারতে চলে যান। এরপর বাড়িটির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় মহকুমা প্রশাসনের হাতে।
সময়ের প্রবাহে একসময় জমজমাট সেই বাড়ি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। যত্নের অভাবে স্থাপনার বিভিন্ন অংশ ক্ষয়ে যেতে থাকে। কিন্তু পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি তার স্মৃতি।
বিক্রমপুরের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, জমিদারবাড়ি, স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বসতভিটা এবং বহু বিশিষ্ট মানুষের স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। কোথাও দখল, কোথাও অবহেলা, আবার কোথাও সংরক্ষণের অভাবে ইতিহাসের দৃশ্যমান চিহ্নগুলো হারিয়ে গেছে।
এই বাস্তবতায় যদুনাথ রায়ের বাড়ির অবশিষ্ট অংশ টিকে থাকা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
জমিদারবাড়ির আঙিনায় ইতিহাসের নতুন ঠিকানা:
যে উঠানে একসময় জমিদার পরিবারের মানুষের চলাচল ছিল, সেই উঠানেই এখন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, লোকজ উপকরণ ও বিক্রমপুরের নানা স্মৃতি নিয়ে ইতিহাসের চর্চা হচ্ছে।
‘বিক্রমপুর জাদুঘর’ সংরক্ষণ করছে বিক্রমপুরের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য, প্রাচীন নিদর্শন, স্থানীয় ইতিহাস, লোকসংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং মানুষের জীবনযাত্রার নানা উপকরণ।
অর্থাৎ একটি পরিত্যক্ত জমিদারবাড়ির আঙিনা যেন নতুন করে পেয়েছে প্রাণ—অতীতকে আঁকড়ে ধরে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাস পৌঁছে দেওয়ার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে।
শোভাবাজারে এখনও টিকে আছে যদুনাথের মুখ:
ভাগ্যকূল থেকে বহু দূরে কলকাতার শোভাবাজার।
সেখানকার একটি বাড়ির বৈঠকখানায় এখনও টাঙানো রয়েছে যদুনাথ রায়ের পুরোনো একটি ছবি।
সময় বদলেছে। সীমান্ত বদলেছে। মানুষের বসতি বদলেছে। কিন্তু ছবিটি রয়ে গেছে। একটি পরিবারের স্মৃতির ভেতর দিয়ে যেন ভাগ্যকূলের সেই বাড়ির সঙ্গে সম্পর্কটিও টিকে আছে।
সম্প্রতি কলকাতার শোভাবাজারে গিয়ে সেই ছবির ছবি তুলে নিয়ে এসেছেন আব্দুর রশিদ খান।
ছবিটি তাই এখন শুধু একটি পুরোনো আলোকচিত্র নয়। এটি যেন দুই বাংলার দুই প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা একই পরিবারের ইতিহাসের দৃশ্যমান সেতু।
ভিডিও পর্দায় ফিরে আসে পূর্বপুরুষের বাড়ি:
কলকাতার শোভাবাজারে বসবাসরত যদুনাথ রায়ের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিক্রমপুর জাদুঘরের যোগাযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন সময়ে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তাঁদের দেখানো হয়েছে তাঁদের পূর্বপুরুষের সেই বাড়ি—যে বাড়ি তাঁরা হয়তো বহু বছর ধরে চোখে দেখেননি।
দূর কলকাতায় বসে যখন তাঁরা ভিডিও পর্দায় দেখতে পেয়েছেন ভাগ্যকূলের সেই বাড়ির আঙিনা, আর সেখানে তাঁদের পূর্বপুরুষের স্মৃতিবাহী স্থাপনার পাশে গড়ে ওঠা বিক্রমপুর জাদুঘর, তখন তাঁদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আনন্দ, আবেগ ও গর্বের অনুভূতি।
একসময় যে বাড়ি ছেড়ে তাঁদের পূর্বপুরুষকে চলে যেতে হয়েছিল, বহু বছর পর সেই বাড়িই আবার ইতিহাসের আলোচনায় ফিরে এসেছে।
আসার কথা ছিল, কিন্তু আসা হয়নি:
প্রায় দুই বছর আগে রায় পরিবারের একটি বড় দল বাংলাদেশে এসে তাঁদের পূর্বপুরুষের ভিটা ও বাড়ি দেখার জন্য ভিসা নিয়েছিল।
কিন্তু বাংলাদেশের তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে শেষ পর্যন্ত তাঁদের সেই সফর স্থগিত হয়ে যায়।
তবু ইচ্ছেটি রয়ে গেছে—একদিন তাঁরা আবার আসবেন। দাঁড়াবেন সেই বাড়ির সামনে। দেখবেন তাঁদের পূর্বপুরুষের বসতভিটা। হয়তো স্পর্শ করবেন সেই মাটিও।
একটি পরিবারের কাছে সেটি নিছক ভ্রমণ নয়; এটি হবে শিকড়ে ফিরে যাওয়ার এক আবেগঘন যাত্রা।
কিউরেটরের শোভাবাজার যাত্রা:
বিক্রমপুর জাদুঘরের কিউরেটর নাছির উদ্দিন আহমেদও বেশ কয়েকবার কলকাতার শোভাবাজারে যদুনাথ রায় পরিবারের বাড়িতে গিয়েছেন।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ও যোগাযোগের মাধ্যমে সংগ্রহের সুযোগ হয়েছে পুরোনো ছবি, পারিবারিক স্মৃতি এবং ঐতিহাসিক নানা তথ্য।
এ ধরনের যোগাযোগ একটি আঞ্চলিক জাদুঘরের কাজকে শুধু নিদর্শন সংরক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না; বরং একটি পরিবারের ব্যক্তিগত স্মৃতিকে বৃহত্তর আঞ্চলিক ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি করে।
একটি পুরোনো ছবি, একটি পারিবারিক গল্প কিংবা কোনো প্রবীণের স্মৃতিচারণ—এসবই একদিন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠতে পারে।
ইতিহাসের বাড়িটি কি টিকবে?
তবে এই গল্পের মধ্যে আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে উদ্বেগও।
বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে যদুনাথ রায়ের বাড়ি দখল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কার কথা উঠে এসেছে। ফলে ইতিহাসের এই স্থাপনাটি ভবিষ্যতে দখল, অবৈধ হস্তক্ষেপ কিংবা ধ্বংসের শিকার হতে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে স্থানীয় ইতিহাসপ্রেমী ও সচেতন মহলে।
বিক্রমপুরের বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে। একটির পর একটি পুরোনো বাড়ি যখন সময়ের স্রোতে বিলীন হচ্ছে, তখন যদুনাথ রায়ের বাড়ির অবশিষ্ট অংশ রক্ষা করা শুধু একটি স্থাপনা সংরক্ষণের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি অঞ্চলের সামগ্রিক ইতিহাস।
শুধু বাড়ি নয়, সংরক্ষণ করতে হবে স্মৃতিও:
ইতিহাস সংরক্ষণের কাজ শুধু পুরোনো দেয়াল টিকিয়ে রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
যদুনাথ রায় পরিবার সম্পর্কিত পুরোনো ছবি, দলিল, পারিবারিক স্মৃতিচিহ্ন এবং মৌখিক ইতিহাসও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাড়িটির যথাযথ জরিপ, সীমানা নির্ধারণ এবং আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগে ঐতিহাসিক স্থাপনাটিকে সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু একটি পুরোনো বাড়িই দেখতে পাবে না—তারা দেখতে পাবে একটি সময়ের সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার গল্প।
একই ইতিহাসের দুই প্রান্ত:
কলকাতার শোভাবাজারের বৈঠকখানায় টাঙানো যদুনাথ রায়ের ছবি। আর মুন্সীগঞ্জের ভাগ্যকূলের উত্তর বালাসুরে তাঁর ঐতিহাসিক বাড়ির আঙিনায় প্রতিষ্ঠিত বিক্রমপুর জাদুঘর। দুটি জায়গা। দুটি ভূগোল। অথচ ইতিহাস একটাই।
এক প্রান্তে পূর্বপুরুষের ছবি আঁকড়ে ধরে থাকা উত্তরসূরিরা। অন্য প্রান্তে সেই পূর্বপুরুষের বসতভিটার আঙিনায় ইতিহাস সংরক্ষণের চেষ্টা। সীমান্ত হয়তো মানুষকে আলাদা করেছে, কিন্তু স্মৃতি সবসময় সীমান্ত মানে না।
শোভাবাজারের একটি বৈঠকখানা থেকে ভাগ্যকূলের একটি পুরোনো বাড়ি—দুই জায়গার মাঝখানে তাই তৈরি হয়েছে ইতিহাসের এক অদৃশ্য সেতু।
বিক্রমপুর জাদুঘরের কিউরেটর নাছির উদ্দিন আহমেদের ভাষায়, ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষা করা মানে শুধু একটি পুরোনো বাড়ি রক্ষা করা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি, মানুষের স্মৃতি এবং শিকড়।
যদুনাথ রায়ের বাড়িটিও তাই শুধু একটি জমিদারবাড়ি নয়।
এটি বিক্রমপুরের অতীতের একটি জীবন্ত দলিল—যেখানে একটি পরিবারের গল্প, একটি অঞ্চলের ইতিহাস এবং দুই বাংলার বিচ্ছিন্ন অথচ অটুট স্মৃতির বন্ধন আজও পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।