প্রকৃতির এক অপরূপ সুন্দর ফুল নীল অপরাজিতা বা নীলমণি লতা । এর বৈজ্ঞানিক নাম ক্লাইটোরিয়া টার্নেটে । আকর্ষণীয় এই ফুলের ইংরেজি নাম হচ্ছে: এশিয়ান পিজিয়ন উয়িংস, বাটারফ্লাই পী, ব্লু বেল, ব্লু পী ভাইন, মাসেল-শেল ক্লাইম্বার ইত্যাদি । নীল অপরাজিতা ফুল সাধারণত গাঢ় নীল রঙের হয় । ফুলের ভেতরের দিকটা সাদা এবং কখনো একটু হলদে আভাযুক্ত হয়ে থাকে । লাল, হলুদ, নীল, সাদা ও হালকা বেগুনী রঙের অপরাজিতা ফুল দেখা যায় । তবে, কিছু প্রজাতি দেখতে অনেকটা প্রজাপতির মত । সাদা অপরাজিতা ফুল মহেশ্বেতা নামে পরিচিত । অপরাজিতা বর্ষজীবী লতা জাতীয় উদ্ভিদ এবং অনেক লম্বা হয় । এটি আশেপাশের উঁচু গাছ বেয়ে তরতর করে বেড়ে ওঠে । বিচ্ছিন্ন বা নিঃসঙ্গভাবে সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে নীল ফুল ফুটে তার সৌন্দর্যকে বিলিয়ে দেয় । অপরাজিতার সবুজ পাতাগুলো গোলাকার বা ডিম্বাকৃতি । সারা বছরই ফুল ফুটে থাকে এবং ফুলে কোনো গন্ধ নেই । অপরাজিতার ফল দেখতে শিমের মত । সাধারণত এর বীজ মাটিতে পড়ে নিজ থেকেই চারা বের হয় এবং বীজের মাধ্যমে বংশবিস্তার করে । এছাড়া, খুব সহজেই বীজ থেকে নতুন চারা উৎপাদন করা যায় । চিরসবুজ এই শোভাবর্ধক ফুল গাছটি ঝোপঝাড়, বন, আশেপাশের উঁচু গাছ, বাড়ির আঙিনা, টব এবং বাগানে জন্মে থাকে । শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষা ছাড়াও যে কোনো ঋতুতে নিজ মহিমায় এই গাছ থেকে ফুল ফুটে । তবে, ফুল ফোটার পরিমাণ কখনো কম-বেশী হয় । এই ফুল গাছের প্রধান শত্রু হচ্ছে পানি এবং গাছের গোড়ায় পানি জমলে মৃত্যুর সম্ভাবনাই বেশি । ধারণা করা হয়, মালাক্কা দ্বীপপুঞ্জের টার্নেট আইল্যান্ড হচ্ছে অপরাজিতা ফুল গাছের উৎপত্তিস্থল । তাই, এই উদ্ভিদ প্রজাতিটির নাম রাখা হয়েছে টার্নেটে । অপরাজিতা উদ্ভিদ ক্লাইটোরিয়া গনভুক্ত এবং এর ফুলের আকার ও আকৃতি দেখতে প্রায় মানুষের স্ত্রী যৌনাঙ্গের মতই (ফিমেল জেনিটালস) । এজন্যই, ক্লাইটোরিস শব্দ থেকে ল্যাটিন ভাষায় এর মহাজাতির নামকরণ হয় ক্লাইটোরিয়া বা যোনীপুষ্প । প্রখ্যাত সুইডিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও প্রাণীবিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়াস মানুষের স্ত্রী যৌনাঙ্গের আকৃতি এবং উদ্ভিদে প্রাপ্ত রাসায়নিক উপাদানের উপর নির্ভর করে এই গাছটির বংশকে ক্লাইটোরিয়া ও প্রজাতিকে টার্নেটে নামকরণ করেন । সত্যিই, এই ফুল গাছটি প্রকৃতির এক অনুপম সৃষ্টি । অসাধারণ সুন্দর নীল অপরাজিতায় আছে নীলের রাজত্ব । রূপমাধুর্য, মাহাত্ম্য, ঐশ্বর্য এবং আভিজাত্যের কারণেই ফুলটি অপরাজিতা, অপরাজেয়, অজেয় বা অদ্বিতীয়া । এই ফুলটি পবিত্র এবং পূজনীয় । বৃষ্টিস্নাত নীল অপরাজিতা ফুল অনেকের দৃষ্টি কেড়ে নেয় এবং মন উদ্বেলিত করে । অপরাজিতা ফুল গাছটি কেবল শুধু চমৎকার সৌন্দর্যেই নয়, বরং এর রয়েছে এক বিশেষ ঔষধি গুণাগুণ । দৃষ্টিনন্দন এই গাছের ফুল, পাপড়ি, লতা এবং মূল বা শিকড় বিভিন্ন রোগের মহৌষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয় । ত্বকের রূপচর্চা, চুল পড়া রোধ, হজমশক্তি বৃদ্ধি, জোলাপ বা রেচক (কোষ্ঠকাঠিন্য হলে), মূত্রবর্ধক, বয়ঃসন্ধিকালীন অস্থিরতা বা উৎকণ্ঠা হ্রাস, মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি, শোথ বা ফুলা, দৃষ্টিশক্তির দুর্বলতা, প্রসবকালীন ব্যাথানাশক, শুষ্ক কাশি, মূর্ছিত হত্তয়া বা জ্ঞান হারানো, পাকস্থলীর কার্যকারিতা, চর্মরোগ, গলার ক্ষত (গলগন্ড রোগ), আব, কান ব্যাথা এবং সাপ ও পোকা-মাকড়ের কামড়ে বিশেষভাবে কার্যকরী । এছাড়া, নীল অপরাজিতার পাপড়ী দিয়ে তৈরি চা এর স্বাদ অতুলনীয়, যার ক্ষতিকর দিক কম ও আশঙ্কামুক্ত । তাইতো, এই অনন্য সুন্দর অপরাজিতা সম্পর্কে কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী’র কি দারুণ এক গভীর উপলব্ধি:
পরাজিতা তুই সকল ফুলের কাছে,
তবু কেন তোর অপরাজিতা নাম ?
গন্ধ কি তোর বিন্দুমাত্র আছে ?
বর্ণ- সেও তো নয় নয়নাভিরাম ।
ক্ষুদ্র সেফালি, তারও মধুর-সৌরভ;
ক্ষুদ্র অতসী, তারও কাঞ্চন-ভাতি;
গরবিণি, তোর কিসে তবে গৌরব!
রূপগুণহীন বিড়ম্বনার খ্যাতি!
কালো আঁখিপুটে শিশির-অশ্রু ঝরে—
ফুল কহে— মোর কিছু নাই কিছু নাই,
তোমরা যে নামে ডাকিয়াছ দয়া করে,
আমি শুধু ভাই, তাই— আমি শুধু তাই ।
ফুলসজ্জায় লজ্জায় যাই নাক,
পুষ্পমালায় নাহিক আমার স্থান,
প্রিয় উপহারে ভুলেও কি মোরে ডাক?
বিবাহ-বাসরে থাকি আমি ম্রিয়মাণ ।
মোর ঠাঁই শুধু দেবের চরণতলে,
পূজা-শুধু-পূজা জীবনের মোর ব্রত;
তিনিও কি মোরে ফিরাবেন আঁখিজলে—
অন্তরযামী,— তিনিও তোমারি মতো?
* ছবি: নিজ, তথ্যসূত্র: আন্তর্জাল, উইকিপিডিয়া ।