বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও মুক্তচিন্তার আন্দোলনের ইতিহাসে ১১ জুন একটি বেদনাবিধুর দিন। ২০১৮ সালের এই দিনে মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরের কাকালদি গ্রামে উগ্র মৌলবাদীদের গুলিতে নিহত হন প্রকাশক, লেখক, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক শাহজাহান বাচ্চু। তাঁর হত্যাকাণ্ড শুধু একজন ব্যক্তির জীবনাবসান ছিল না; এটি ছিল মুক্তচিন্তা, মানবিক মূল্যবোধ ও প্রগতিশীল সমাজ নির্মাণের স্বপ্নের ওপর একটি বর্বর আঘাত।
সেদিন সন্ধ্যায় তিনি স্থানীয় একটি ওষুধের দোকানে বসে পরিচিতজনদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন। হঠাৎ দুটি মোটরসাইকেলে চারজন সশস্ত্র উগ্রপন্থী এসে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তারা দ্রুত পালিয়ে যায়। পরে তদন্তে জানা যায়, হত্যাকারীরা জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল।
উগ্রবাদবিরোধী সংগ্রামের ধারাবাহিকতা
বাংলাদেশে মুক্তচিন্তা ও প্রগতিশীলতার বিরুদ্ধে উগ্রপন্থী সহিংসতার ইতিহাস দীর্ঘ। ২০০৪ সালে ভাষাবিদ ও লেখক ড. হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইউনুস হত্যার মধ্য দিয়ে এর একটি ভয়াবহ রূপ দেখা যায়। ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরু হওয়ার পর ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার হত্যার মাধ্যমে নতুন করে একের পর এক মুক্তমনা মানুষকে টার্গেট করা হয়। লেখক, ব্লগার, প্রকাশক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা ক্রমাগত হামলার শিকার হতে থাকেন।
এই সময়েই শাহজাহান বাচ্চুর নামও উগ্রপন্থীদের তথাকথিত ‘হিটলিস্টে’ অন্তর্ভুক্ত হয়। তিনি নিয়মিত হত্যার হুমকি পেতেন। তবু বিশ্বাস ও আদর্শ থেকে একচুলও সরে যাননি।
প্রকাশক ও সংস্কৃতি সংগঠক শাহজাহান বাচ্চু
১৯৫৮ সালে মুন্সীগঞ্জের কাকালদি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শাহজাহান বাচ্চু। ছাত্রজীবনে মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীতে জাপানে প্রবাসজীবন শুরু করলেও সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর অনুরাগ অটুট ছিল।
জাপানে অবস্থানকালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বিশাকা প্রকাশনী’। তাঁর কন্যা বিপাশা, স্ত্রী কানন এবং নিজের নামের আদ্যক্ষর মিলিয়ে এই প্রকাশনীর নামকরণ করা হয়। শুধুমাত্র কবিতার বই প্রকাশের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত এই প্রকাশনী থেকে ছয় শতাধিক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। শতাধিক কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের সৌভাগ্যও অর্জন করে বিশাকা প্রকাশনী।
প্রকাশক হিসেবে তিনি ছিলেন নবীন লেখকদের অকৃত্রিম বন্ধু। সাহিত্যচর্চা ও সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়।
বিন্দু থেকে বৃত্তকে কাঁপানোর স্বপ্ন
শাহজাহান বাচ্চু শুধু প্রকাশক বা লেখক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর প্রোফাইল ছবিতে প্রায়ই দেখা যেত দোয়েল পাখি। বিভিন্ন আড্ডা ও আলোচনায় তিনি বলতেন, “একটি দোয়েল শিস দিয়ে যায়, বিন্দু থেকে বৃত্তকে কাঁপায়।”
এই দর্শনের মধ্যেই নিহিত ছিল তাঁর সমাজ পরিবর্তনের ভাবনা। তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে যদি একজন মানুষও মুক্তচিন্তা, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে কথা বলে, তবে সেই ছোট্ট বিন্দুই একদিন বৃহৎ সমাজকে নাড়িয়ে দিতে পারে। তাঁর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, পাঠচক্র, আলোচনা সভা ও সামাজিক উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল এই চিন্তার বিস্তার।
সাংবাদিকতা, রাজনীতি ও আন্দোলন
সাপ্তাহিক ‘সেবা’ পত্রিকায় লেখালেখির মাধ্যমে সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হয় তাঁর। পরে দীর্ঘদিন সম্পাদনা করেন ‘আমাদের বিক্রমপুর’ পত্রিকা। ১৯৮৪ সালে বিক্রমপুর প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং সংগঠনটির অন্যতম সহ-সভাপতি ছিলেন।
রাজনৈতিকভাবেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মুন্সীগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গণজাগরণ মঞ্চ, তেল-গ্যাস রক্ষা আন্দোলন, সুন্দরবন রক্ষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনে তিনি সরব উপস্থিতি রেখেছেন।
হুমকির মধ্যেও আপসহীন
দীর্ঘদিন ধরে হত্যার হুমকি পেলেও শাহজাহান বাচ্চু তাঁর অবস্থান থেকে সরে যাননি। তিনি জানতেন, তাঁকে অনুসরণ করা হচ্ছে। বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনায় প্রায়ই হুমকির বিষয়টি উঠে আসত। তবু তিনি মনে করতেন, ভয়কে প্রশ্রয় দিলে অন্ধকার শক্তিরাই বিজয়ী হবে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ২০১৮ সালের ১১ জুন সেই অন্ধকার শক্তির গুলিতেই থেমে যায় তাঁর জীবন। কিন্তু থেমে যায়নি তাঁর স্বপ্ন।
মৃত্যুর পরেও তিনি জীবন্ত
যারা শাহজাহান বাচ্চুকে হত্যা করেছিল, তারা ভেবেছিল মুক্তচিন্তার কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করা যাবে। বাস্তবে ঘটেছে তার উল্টো। তাঁর জীবন, সংগ্রাম ও আদর্শ আজও নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, একজন মানুষকে হত্যা করা সম্ভব হলেও তাঁর চিন্তা ও আদর্শকে হত্যা করা যায় না।
প্রতি বছর ১১ জুন তাঁর হত্যার প্রতিবাদে এবং স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে মানুষ সমবেত হয়। এই স্মরণ শুধু একজন মানুষের জন্য নয়; এটি মুক্তচিন্তা, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার অঙ্গীকার।
শাহজাহান বাচ্চু আজ ইতিহাসের অংশ। তিনি মৃত্যুকে অতিক্রম করে হয়ে উঠেছেন এক মৃত্যুঞ্জয়ী প্রতীক—যিনি সত্যিই বিন্দু থেকে বৃত্তকে কাঁপাতে চেয়েছিলেন।